আন্তর্জাতিক

শেখ হাসিনার অবস্থান: ‘অনুপ্রবেশকারী’ নাকি ‘শরণার্থী’? আন্তর্জাতিক আইনের মারপ্যাঁচ

আকতার   নিউজ ডেস্ক

১১ এপ্রিল ২০২৬


| ছবি: 

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। ভারত সরকার তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে আশ্রয় দিলেও, বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে—আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে তিনি ঠিক কোন অবস্থানে আছেন? তাকে কি ‘শরণার্থী’ বলা যায়, নাকি তিনি ‘অনুপ্রবেশকারী’?আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (UNHCR)-এর গাইডলাইন অনুযায়ী, শরণার্থী হিসেবে বিবেচিত হতে হলে কিছু নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হয়। শরণার্থী তারাই, যারা জাতিগত, ধর্মীয়, জাতীয়তা বা কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে নির্যাতনের শিকার হওয়ার ভয়ে নিজ দেশ ছেড়ে পালিয়ে অন্য দেশে আশ্রয় নেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে এই সংজ্ঞার প্রয়োগ বেশ জটিল:

  • শরণার্থী হিসেবে দাবি: শেখ হাসিনার অনুসারী এবং ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তাকে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাদের যুক্তি, বাংলাদেশে তার জীবনের নিরাপত্তা নেই এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে তাকে সুরক্ষা প্রদান করা একটি মানবিক ও কূটনৈতিক দায়িত্ব।

  • অনুপ্রবেশকারী হিসেবে অভিযোগ: অন্যদিকে, বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সমর্থক এবং একাংশের দাবি, তিনি নিয়মবহির্ভূতভাবে সীমান্ত অতিক্রম করেছেন এবং বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা থাকায় তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি। যারা এই মত পোষণ করেন, তারা তাকে আইনি বাধ্যবাধকতার বাইরে থাকা একজন ব্যক্তি হিসেবেই দেখতে চাইছেন।

  • ভারত সরকার বরাবরই শেখ হাসিনাকে ‘রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী’ হিসেবেই বিবেচনা করে আসছে। দিল্লির পক্ষ থেকে বারবার জানানো হয়েছে যে, ভারত তার প্রতিবেশী দেশগুলোর নেতৃবৃন্দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় এটিকে ‘কূটনৈতিক আশ্রয়’ (Diplomatic Asylum) বলা হয়, যা সাধারণ শরণার্থীর সংজ্ঞার চেয়ে কিছুটা ভিন্ন।ভারত কোনো দেশের সঙ্গে অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তিতে (Extradition Treaty) আবদ্ধ থাকলে, সেই দেশের আইনি প্রক্রিয়ার অনুরোধে ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে সেক্ষেত্রেও ‘রাজনৈতিক অপরাধের’ একটি বড় ছাড় থাকে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলো যদি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রতীয়মান হয়, তবে আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী ভারত তাকে হস্তান্তর না করার অধিকার রাখে।আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বিতর্ক মূলত আইনি চেয়েও বেশি রাজনৈতিক। শেখ হাসিনাকে ‘শরণার্থী’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’—কোনো নির্দিষ্ট তকমায় বিচার করা কঠিন, কারণ ভারত সরকার তাকে রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে আশ্রয় দিয়েছে। এটি মূলত দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণেরই প্রতিফলন।পরিশেষে, শেখ হাসিনার এই অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্কের জন্য এক বড় পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জটিল সমীকরণে শেষ পর্যন্ত তার ভাগ্যে কী আছে, তা সময়ই বলে দেবে।